এ বি এস রুমন
![]() |
| এ বি এস রুমন |
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ-লেখালেখি টা কি শখবশত?
এ.বি.এস রুমনঃ-লেখালেখি একই সাথে অামার শখ অাবার নেশা। শখের বসে হয়ত একটা গল্প লিখতে শুরু করলাম এই গল্পই নেশার মত হয়ে যায়, শেষ না করা পর্যন্ত শান্তি পাই না।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- কেমন লাগে এই বিচিত্র জগৎ?
এ.বি.এস রুমনঃ-অবশ্যই ভালো লাগে, কিন্তু লেখার মাঝে যখন ঢুকে যাই অার চরিত্রগুলোকে বসে অানতে পারি না খুব অস্বস্তিতে ভুগি। তবে এই অস্বস্তির মাঝেও একধরণের সুখ অাছে।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ-কোন ধরণের লেখা বেশি লেখা হয়? রোমান্টিক?
এ.বি.এস রুমনঃ-এটা বলা অাসলে অামার জন্য কঠিন। অামি ধরণকে উদ্দেশ্য করে একদমই অাগাই না। 'ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর' এর কথাই যদি বলেন, এটাকে অাপনি রোমান্টিক বলতে পারবেন না। রোমান্টিকতা যেমন অাছে, সামাজিকতাও অাছে, ধর্ম, দর্শন, নৈতিকতা সর্বপরি সবই পাবেন। অামি জানি না উপন্যাসটিকে কোন ক্যাটাগরিতে ফেলা যাবে। অামার কাজ ছিল লেখা, সমাজে পজিটিভ ম্যাসেজ দেয়া, অামি দিয়েছি। বাকিটা পাঠকই বিচার করবেন। তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন অামি কোন ধরণের লেখা লিখি। কোন ক্যাটাগরির লেখা লিখি।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ-আপনার লেখার ফ্যান তো কম নয়। তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?
এ.বি.এস রুমনঃ-অামি অামার পাঠকদের একটা কথাই বলব, সুস্থ বই পড়ুন, সমাজে সুস্থতার চর্চা করুন। অনেকে প্রচুর বই পড়েন। কিন্তু দিন শেষে অফিসে গিয়ে ঘুষ নেন, ফুটওভার ব্যবহার না করে রাস্তায় জ্যাম লাগান। পাঠক, লেখক বা বড় অফিসার হবার অাগে অামাদের মানুষ হবার চর্চা সবার অাগে করা উচিত।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- আচ্ছা সাধারণত আমরা প্রথমেই একটা লেখালেখি শুদ্ধভাবে করতে পারি না । চিন্তাশক্তির প্রয়োজন হয় অবশ্যই । এই চিন্তাশক্তি সৃষ্টি কী আপনি ছোটবেলা থেকে শুরু করেছিলেন? আর একজন শিশু প্রখ্যাত লেখক হতে চায় । এক্ষেত্রে কী সে ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যাস করবে না আগে চিন্তাশক্তির বিস্তার ঘটিয়ে তারপর লেখালেখি শুরু করবে? এ.বি.এস রুমনঃ-লেখালিখি নিয়ে অামার চিন্তাভাবনা শুরু কবে থেকে সেটা বলা অাসলে খুব মুশকিল। তবে প্রথম কবিতা লিখেছিলাম ক্লাস টু বা থ্রিতে থাকতে। অার দেখুন, অামার মতে অাপনি যদি গণিতে ভালো করতে চান অাপনাকে নিয়মিত অনুশীলনের উপরে থাকতে হবে। কেবল গণিতে ভালো করতে অনুশীলন লাগবে তা কেন! সব কাজই তাই। ভালো থাকতে চাইলেও ভালো থাকা অনুশীলন করতে হয়, ভালো লেখক হবার জন্য অনুশীলন প্রয়োজন হয়। একটা শিশু যদি লেখক হতে চায় তবে অামি বলব প্রচুর পড়তে, চারপাশের জগৎকে ভালোভাবে দেখতে অার লিখে যেতে। লিখতে লিখতে একসময় লেখার মান ভালো হবে, লিখতে লিখতে একসময় সে নিজের ঘাটতি, শক্তিমত্ত্বা বুঝতে শুরু করবে এবং অামার বিশ্বাস অবশ্যই সে একদিন ভালো লেখকে পরিণত হবে।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- লেখালিখি আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বলতে চান?
এ.বি.এস রুমনঃ-অামি লেখালিখির ব্যাপারে খুব সেন্সিটিভ। অামার ব্যক্তিগত দর্শন হল, অামি যতদিন বাঁচি ভুড়িভুড়ি বই না লিখে সময় নিয়ে ভালো মানের বই লিখবো। একটা বই লিখতে যদি অামার দশ বছর লাগে তো লাগুক, অামার মতে দশটা মোটামুটি মানের বই লেখার চেয়ে সময় নিয়ে একটা ভালো বই লেখা বেশি জরুরী। পাঠক কখনও কুয়ান্টিটি মনে রাখেন না, পাঠক মনে রাখেন কেবল কুয়ালিটি সম্পন্ন বইগুলোকেই।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ-বেশিরভাগ মানুষই অনলাইনে লেখা শুরু করে। জনপ্রিয়তা পায়। তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- অনেক ক্ষেত্রেই পিতা মাতা এই কো কারিকিউলাম অ্যাক্টিভিটিজ ভালো চোখে দেখেন না। হয়তো ছেলে বা মেয়ে লেখালেখি করতে চায়, কিন্তু এই পরিবেশ টা বাধা দিচ্ছে , এ সম্পর্কে আপনার কি অভিমত? এ.বি.এস রুমনঃ-মিশ্র প্রতিক্রিয়া। দুপক্ষকেই সহনশীল হতে হবে। সমাজে ভালো বই যেমন জরুরী, শিক্ষাও তেমনি জরুরী। অাগামীকাল যদি রবীন্দ্রনাথের এসএসসি পরীক্ষা হয় অার তিনি অাজ রাতে গীতাঞ্জলিও লিখতে বসেন অামি অবশ্যই বাঁধা দেব এটা যেমন সত্যি তেমনি অামাদের অভিভাবকদের মাথায় রাখতে হবে সৃজনশীল যেকোন কাজে সন্তানকে উৎসাহ প্রদান জরুরী। সেটার জন্য সন্তানদের উপযুক্ত উৎসাহ প্রদান অবশ্যই দেয়া উচিত। উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- অামাদের তরুণ প্রজন্ম এর প্রতি আপনি কি কিছু বলতে চান? এ.বি.এস রুমনঃ-অামি তো মনে করি অামাদের তরুণেরা ঠিক পথে অাছে। যাঁরা সড়ক অান্দলনের মত এতোবড় অান্দোলনে দারুণ ম্যাচিউরিটি দেখালো তাঁদের নিয়ে না উৎসাহী হয়ে উপায় নেই। অামাদের সময়ের চেয়ে এখনকার তরুণেরা অবশ্যই বেশি জানে। অামি মিলিয়ন ডলার বাজি রেখে বলতে পারি অাজকের তরুণদের হাতে অামাদের দেশ সর্বোচ্চ অবস্থানে যাবে। তাঁদের ভেতর থেকে হুমায়ূন অাজাদ, রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই বের হবে। অামি কেবল বলব যে অালোর সম্ভাবনা তোমরা দেখালে সেটা ধরে রাখো, সুস্থতার অামৃত্যু চর্চা করো। ভালো কিছু হবেই হবে। উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- লাইব্রেরি সম্পর্কে কি অভিমত? এইযে বেঙ্গল বই, বাতিঘর, এগুলো সম্পর্কে আপনার মতামত কি? এ.বি.এস রুমনঃ-অামার ক্ষমতা থাকলে অামি দেশের ৮৪০০০ গ্রামে ৮৪০০০ লাইব্রেরি বানাতাম। অামি বিশ্বাস করি, অাপনার ঘরে গীতাঞ্জলি থাকলে অাপনি পাঠক হন বা না হন একদিন হাতে নিয়ে দু একপাতা পড়বেনই। লাইব্রেরি থাকলে পাঠক তৈরি হবেই। বেঙ্গল বই, বাতিঘরের মত ক্রিয়েটিভ চিন্তা নিয়ে অারো অনেকে এগিয়ে অাসুক সেই কামনা সবসময় রইলো। উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- বাংলা সাহিত্যের প্রতি আপনার অনুরাগ কি ছোটবেলা থেকেই? এ.বি.এস রুমনঃ-সাহিত্য পাঠের উদ্দেশ্যে সাহিত্যকে হাতে নিয়েছি যখন অামার বয়স ১৯। অামি প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে উঠে এসেছি। পাঠ্যবই ই অামাদের হাতে ঠিকভাবে পৌছাতো না। পুরাতন পত্রিকার সাহিত্য পাতাই অামাকে প্রথম পাঠ্যবইয়ের বাইরে পাঠক করে তুলেছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রচুর বই পড়ার সৌভাগ্য অামার হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- আপনার শেষ বই টি সম্পর্কে কিছু বলুন। কেমন সাড়া পাচ্ছে " ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর"?
এ.বি.এস রুমনঃ-যতটা না কল্পনা করেছিলাম তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পাবেন অামার প্রকাশক বদরুল মিল্লাত স্যার এবং পাঠকেরা। তাঁরা যেভাবে বইটার পেছনে শ্রম দিয়েছেন তা কেবল বলে শেষ হয় না।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- উচ্ছ্বাস প্রহর সম্পর্কে আপনার মতামত কি? এ.বি.এস রুমনঃ-উচ্ছ্বাস প্রহরের চিন্তা, চেতনা এবং উদ্দেশ্য প্রচণ্ড স্বচ্ছ। যেটা অামি অাগেও বলেছিলাম তাই অাবার বলব। এখনকার তরুণেরা যা করছে অামাদের তরুণ বয়সে অামরা এসব কল্পনাও করতে পারতাম না। অথচ এখনকার একঝাঁক তরুণ উচ্ছ্বাস প্রহর কেবল দাঁড় করালো তাই কিন্তু না। তাঁরা এটাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করছে, বড় বড় ইভেন্টের অায়োজন করছে। উচ্ছ্বাস প্রহর ভবিষ্যতে অনেক ভালো করবে বলে অামার বিশ্বাস কারণ এর পেছনে একঝাঁক মেধাবী তরুণ তরুণী অাছে, অাছেন কিছু নিউরণ স্থানীয় মানুষও।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ- লেখালেখির ক্ষেত্রে প্রেরণা পেয়েছেন কার কাছ থেকে?
এ.বি.এস রুমনঃ-শুরুর প্রেরণা পেয়েছি বন্ধু ঋতুর কাছ থেকে। যে সবসময় অামাকে বলত, 'তুই লেখ, পারবি, ভালো হচ্ছে লেখা।' এছাড়া মিতু দিদি, কাওসার স্যার, বদরুল স্যারেরা অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। উচ্ছ্বাস প্রহরঃ-কার লেখা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?
এ.বি.এস রুমনঃ-অামি অাসলে লেখক বিচার করে একদমই বই পড়ি না। তারপরও যদি বলেন তবে শুরুতেই বলব বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর কথা। যাঁর চাঁদের পাহাড়, অারণ্যক, পথের পাঁচালি অামার মনে এখনও দাগ কেটে অাছে। ভালো লাগে অার্নেস্ট হ্যামিংওয়ে, হুমায়ূন অাহমেদ, হুমায়ূন অাজাদ স্যারদের লেখা। ভালো লাগে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা, মার্ক টোয়েনের উপন্যাস সর্বপরি অনেককিছু।
উচ্ছ্বাস প্রহরঃ-বর্তমান প্রজন্মে কেন রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল জন্ম নিচ্ছে না? অামাদের সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী?
এ.বি.এস রুমনঃ-দেখুন, অাপনি চাইলেও অারেকজন অাইনস্টাইন, অ্যারিস্টটল, রবীন্দ্রনাথ অানতে পারবেন না। অারেকটা শচীন অাসবেন না, কিন্তু ভিরাট খলি কিন্তু এসেছেন। যে একে একে সব রেকর্ড নিজের করে নিচ্ছেন। অামরা রবীন্দ্রনাথ নজরুল হয়ত পাইনি, উনাদের সাথে অন্যদের তুলনা চলে না, অামরা কিন্তু ঠিকই অাহমদ ছফা পেয়েছি, হুমায়ূন অাজাদ পেয়েছি। অাজকের ৭১ বছরের শেখ হাসিনা একসময় ফ্রক পড়ে বেণি দিয়ে হাঁটতেন। কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়ে জন্মায় না, কেউ রবীন্দ্রনাথ হয়ে ও জন্মায় না। অাজকের তরুণেরা ট্যালেন্ট। তাঁরা অতীতের যেকোন তরুণদের চেয়ে বেশি জানে, বেশি পরিপক্ব। অামি অাশাবাদী মানুষ, অামি বিশ্বাস করি, তাঁদের অনেকেই ভালো করবে, অনেকেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুলদের চেয়েও বড় হবে। অামাদের সাহিত্যের গভীরতা অনেক, এই সাহিত্য অন্ধকার যুগ পার করে অাবার দাঁড়িয়েছে, তা অাবার অন্ধকারে অন্তত পরের একশো বছরের মাঝে যাবে না বলে অামার বিশ্বাস।

No comments